2 খুলনা বিভাগের রান্না

চুইঝাল ও কোস্টাল ফ্লেভারের এক অপূর্ব মেলবন্ধন

ভোজন ঐতিহ্য ও পরিচিতি খুলনা বিভাগের খাদ্যাভ্যাসে ‘চুইঝাল’-এর তীব্র ঝাঁঝ এবং রান্নায় ‘নারকেলের দুধ’-এর ব্যবহার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। এই অঞ্চলের কোস্টাল ফ্লেভার বা উপকূলীয় স্বাদ ভোজন রসিকদের কাছে দারুণ জনপ্রিয়। এখানকার মানুষ খাবারে ঝাল ও মিষ্টির চমৎকার ব্যালেন্স পছন্দ করেন। খুলনার আতিথেয়তা খুবই আন্তরিক; মেহমান বরণ করতে বাড়িতে বানানো নারকেলের নাড়ু, সন্দেশ বা রসগোল্লার প্রচলন সবচেয়ে বেশি। উৎসবেও থাকে বিশেষ আয়োজন—যেকোনো অনুষ্ঠানে চুইঝাল দিয়ে গরুর বা খাসির মাংস, চিংড়ির মালাইকারি এবং পেঁপে-নারকেলের জর্দা এই অঞ্চলে খুব জনপ্রিয়। মৌসুমী খাবারের মধ্যে শীতে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় পাওয়া যায় খাঁটি মধু। আর বর্ষায় আধিক্য থাকে গলদা ও বাগদা চিংড়ি এবং পারশে ও ভেটকি মাছের।

ফলের সমাহার খুলনার বিভিন্ন রান্না ও পদে নানা রকম ফলের চমৎকার ব্যবহার দেখা যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

  • পেঁপে

  • আমড়া

  • কেওড়া

  • ডুমুর

  • খেজুর

  • নারকেল

সবজির বৈচিত্র্য এই অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী খাবারে ব্যবহৃত প্রধান শাকসবজিগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • এঁচোড়

  • কচুরলতি

  • কচু পাতা ও লাউ পাতা

  • ঘাটকোল/খারকোল

  • আলু ও বেগুন

  • কচুর মুখি

  • মোচা ও লাউ

ভর্তা খুলনার ভর্তা আয়োজনে অন্যতম সেরা ও জনপ্রিয় আকর্ষণ হলো—সিদ্ধ চিংড়ি হাতে মাখা ভর্তা।

স্যুপ বা টক জাতীয় খাবার খাবারের স্বাদ বাড়াতে এই অঞ্চলে বেশ কিছু টক বা স্যুপ জাতীয় পদের প্রচলন রয়েছে। এগুলো হলো:

  • আমড়ার খাট্টা

  • কেওড়ার টক

  • আলু-বেগুন চিংড়ির টক

  • কচুর মুখি চিংড়ির টক

  • পিঠালি

প্রধান খাবার (মেইন কোর্স) খুলনা বিভাগের মূল খাদ্যতালিকায় থাকে তৃপ্তিদায়ক সব পদ। প্রধান খাবার হিসেবে রয়েছে:

  • ভাইটেল চালের ভাত

  • চুইঝালের গরু, খাসি, হাঁস বা মুরগির মাংস

  • চুইঝালের ছোট মাছের চচ্চড়ি

  • হাতে মাখা ভেটকি ভুনা

  • নারকেল দুধে রান্না করা নানা পদ: এঁচোড় চিংড়ি, ডুমুর চিংড়ি, কচুরলতি চিংড়ি, ডিম ভুনা, হাঁসের মাংস, মোচা চিংড়ি এবং ছোলার ডাল।

  • কচু পাতা বা লাউপাতায় বিভিন্ন রকম মাছ ভাপা

  • ঘাটকোল বা খারকোল চিংড়ি বাটা

  • বেলে মাছের ঝুরা

  • বর্ষার গলদা-বাগদা চিংড়ি ও পারশে-ভেটকি মাছ

  • উৎসবের বিশেষ চিংড়ির মালাইকারি

মিষ্টি ও রসালো পিঠাপুলি খুলনার পিঠাপুলি মানেই মিষ্টি ও রসালো এক আয়োজন:

  • রস চুষি বা হাতে কাটা সেমাই পিঠা: হাতে কাটা ছোট ছোট চালের টুকরোকে খেজুরের গুড় ও ঘন দুধে জ্বাল দিয়ে তৈরি করা হয়।

  • পাকান পিঠা: মুগ ডাল, চালের গুঁড়ি ও সিরার সমন্বয়ে তৈরি দারুণ নকশাদার ও সুস্বাদু পিঠা।

  • পাতা পিঠা: গাছের পাতার মতো নকশা করে তেলে ভেজে গুড়ের সিরায় চুবিয়ে এটি তৈরি হয়।

  • নারকেল পুলি: চালের আটার আবরণে ভেতরে নারকেল ও গুড়ের পুর দিয়ে ভাপে বা তেলে ভেজে তৈরি করা হয় এই পিঠা।

  • এছাড়া রয়েছে: দুধ খেজুরের পিঠা বা জিলাপি পিঠা, নারকেল তক্তি বা বরফি, শিয়াই পিঠা, মুখশলা পিঠা বা জামাই মুখ পিঠা, রসপান পিঠা এবং চন্দ্রপুলি।

ডেসার্ট, মিষ্টি ও আচার খাবারের শেষে পরিবেশনের জন্য রয়েছে নানা রকম ঐতিহ্যবাহী আয়োজন:

  • আচার: চুই ঝালের আচার।

  • ডেসার্ট: দুধ লাউ, তিলের ক্ষীর, তিলের খাজা, উৎসবের পেঁপে-নারকেলের জর্দা এবং শীতের সুন্দরবনের খাঁটি মধু।

  • মিষ্টি: প্যাড়া সন্দেশ, ছানার জিলাপি, ক্ষীর কদম, ছানার পোলাউ, মালাই কুলফি এবং মেহমানদারির জন্য বাড়িতে বানানো নারকেলের নাড়ু, সন্দেশ বা রসগোল্লা। মিষ্টির ক্ষেত্রে ১৩০ বছরের পুরনো খুলনার 'ইন্দ্রমোহন সুইটস্'-এর নাম ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

পানীয় খুলনার এই বিশেষ খাদ্যতালিকায় আলাদা করে গ্লাসে পরিবেশনযোগ্য কোনো নির্দিষ্ট পানীয়ের উল্লেখ না থাকলেও, বিভিন্ন রসালো পিঠা, তরকারি ও ডেসার্টে ব্যবহৃত ‘ঘন দুধ’ এবং ‘নারকেলের দুধ’ এই অঞ্চলের খাবারের স্বাদ ও তরল উপাদানের একটি বড় জায়গা দখল করে আছে।

Post a Comment

Previous Post Next Post